জ্বলে উঠুন প্রযুক্তির আলোয় …

দ্রুত নতুন নির্বাচন চান খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: ২০:১৭, জানুয়ারি ২০, ২০১৪
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন খালেদা জিয়া। ছবি: মনিরুল আলমঅতি দ্রুত আলোচনা করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটে নয়, অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় আছে। তিনি সরকারকে ‘ক্ষমতার মোহ’ ছেড়ে আলোচনায় বসে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানান।আজ সোমবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির গণসমাবেশে খালেদা জিয়া এ আহ্বান জানান। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ‘বর্জন করায়’ জনগণকে অভিনন্দন জানাতে বিএনপি ওই সমাবেশের আয়োজন করে।সমাবেশে খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কড়া সমালোচনা করেন। নির্বাচন ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে যৌথ বাহিনী অভিযানের নামে নির্যাতন চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন। সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের জন্য দায়ী করেন সরকারি দলকে। সাতক্ষীরার যৌথ বাহিনীর অভিযানে ‘আদৌ যৌথ বাহিনী’ ছিল কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন বিএনপির চেয়ারপারসন।এ কর্মসূচি ঘোষণার সময় এটি ১৮ দলের কর্মসূচি বলা হলেও গতকাল জানানো হয় এটি বিএনপির কর্মসূচি। তার পরও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা তাতে বক্তব্য দেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা ছিলেন না। দলটির নেতা-কর্মীর উপস্থিতি চোখে পড়েনি।
বেলা দুইটার দিকে শুরু হওয়া সমাবেশে খালেদা জিয়া উপস্থিত হন সোয়া চারটার দিকে। সাড়ে চারটা থেকে এক ঘণ্টার বেশি সময় তিনি বক্তব্য দেন। বক্তব্যের শুরুতে ‘প্রহসনের নির্বাচনে’ অংশ না নেওয়ায় দেশবাসীকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান তিনি। খালেদা জিয়া বলেন, এর মাধ্যমে প্রমাণ হলো গায়ের জোরে সব করা যায় না। নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ তুলে ধরে তিনি বলেন, এসবের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে এই সরকার কলঙ্কিত সরকার। এই সরকার জনগণের সরকার হতে পারে না।
দুপুর ১২টার পর থেকেই ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মিছিল নিয়ে সমাবেশ স্থলে আসতে থাকেন নেতা-কর্মীরা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্বপাশের অংশের মাঝামাঝি জায়গায় তৈরি করা হয় উত্তরমুখী মঞ্চ। মঞ্চের সামনে থেকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের ফটক পর্যন্ত ও এর আশপাশে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর উপস্থিতি চোখে পড়ে।
আলোচনার আহ্বান
এক ঘণ্টার বক্তব্যে খালেদা জিয়া একাধিকবার সরকারকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। দাবি জানান, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দেওয়ার। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আসুন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করে দেশের মানুষকে শান্তি দিই। দেশপ্রেমিক হয়ে থাকলে জুলুম না চালিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেবেন।’ তিনি বলেন, সংকট নিরসনে অতি দ্রুত আলোচনা প্রয়োজন। আলোচনায় বসে সমস্যা সমাধান করে নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানান তিনি। খালেদা জিয়া বলেন, দেশে শান্তি, স্বস্তি ও গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন প্রয়োজন। বাংলাদেশের সম্মান আজ সারা বিশ্বে ভূলুণ্ঠিত দাবি করে বিএনপির নেত্রী বলেন, দেশের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে এখন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন অতি দ্রুত আলোচনা। নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
বিদেশিরা এ নির্বাচন গ্রহণ করেনি
খালেদা জিয়া বলেন, বিদেশিরাও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গ্রহণ করেনি। তাই বিদেশি বিনিয়োগও আসবে না। সাহায্যও কমে যাবে। তিনি বলেন, প্রত্যেকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনের কথা বলেছেন। না হলে সংকট আরও বাড়বে।
সরকার সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করছে
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, সরকার দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর জন্য সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িত সরকারি দলের লোকজন। তারা ধরা পড়লেও প্রচার করা হচ্ছে না। সরকার ব্যর্থ হচ্ছে তাদের নিরাপত্তা দিতে। একটা কাজ করলে সেটা ঢাকা দেওয়ার জন্য আরেকটা কাজ শুরু করছে। একদিন এর জবাব দিতে হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
সাতক্ষীরা নিয়ে সন্দেহ
সাতক্ষীরায় যৌথ বাহিনীর অভিযান নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন, সন্দেহ আছে দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন কীভাবে মানুষকে নির্যাতন করেছে। আদৌ যৌথ বাহিনীর ছিল কি না, সেটা নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ আছে। বাংলাদেশের পুলিশ ও অন্য বাহিনী এত নিষ্ঠুর হবে, এটা নিয়ে মানুষের সন্দেহ রয়েছে। তাদের কাজকর্ম দেখে মনে হয় না সার্বভৌমত্ব অটুট আছে। ৪২ বছর পর আবার স্বাধীনতা হারাতে বসেছি। এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরা তো এ দৃশ্য দেখার জন্য বেঁচে নেই।’
নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহ
নির্বাচন কমিশনের কঠোর সমালোচন করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, এই আজ্ঞাবহ, মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না, হবে না। এই নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা নেই।
সংসদে সং বসে থাকবে
বর্তমান সরকারকে সম্পূর্ণ অবৈধ দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এ সংসদে কতগুলো সং বসে থাকবে, যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। তাও আবার বিরোধী দলবিহীন সংসদ।’
সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না
খালেদা জিয়া বলেন, এ সরকার যে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, এর প্রমাণ আরেকবার দিল। ১৯৭৫ সালে একদল গঠন করে বাকশাল কায়েম করেছিল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় চারটি সংবাদপত্র রেখে সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিল। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘ইনকিলাব বন্ধ করলেন কেন? তারা পত্রিকায় যেটি ছাপিয়েছে সেটা আগেই ওয়েবসাইট, ফেসবুক ও অনলাইনে এসেছে। সঠিক ব্যাখ্যা না দিয়ে কাগজ বন্ধ করে দিয়েছেন। এর আগে চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, আমার দেশ ও এর নির্দোষ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছেন। এগুলো করা থেকে পিছিয়ে না এলে অতি শিগগিরই এ দেশের জনগণ আপনাদের ক্ষমতা থেকে নামাবে।’
এ সরকার যুবকদের জন্য নয়
সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এবার একদলের অধীনে নির্বাচনে সংসদ বসছে বিরোধী দল ছাড়া। আজকে বুঝতে হবে দেশের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। মানুষ এগুলো চায় না। মানুষ চায় উন্নয়ন, চায় কাজ। মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। সাংবিধানিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা নতুন ভোটার। তোমরা ভোট দিতে পারলে না। এ অবৈধ সরকার আসলে যুবকদের জন্য নয়। নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য। আবার লুটপাট করার জন্য ক্ষমতায় বসেছে। হয়তো দেশটার অস্তিত্ব রাখবে না। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।’
তত্ত্বাবধায়কের জন্য আ.লীগের আন্দোলন
খালেদা জিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতার বাইরে ছিল তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৭৩ দিন হরতাল দিয়েছে, ব্যাংকে আগুন দিয়েছে। গানপাউডার দিয়ে মানুষ মেরেছিল। ১৫ দিন চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ করা দেওয়া হয়েছিল। মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সঙ্গে বোঝাপড়ার (আন্ডারস্ট্যাডিং) মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছে। বহুবার সংবিধান সংশোধন করেছে। এখন বলছে “সংবিধান থেকে একচুলও নড়ব না”। একচুল কেন? বহু হাত নড়ে গেছেন। এখন আর এসব কথা মানায় না। শান্তি, স্বস্তির ধারা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।’ তিনি অভিযোগ করেন, টেন্ডারবাজি, জমি দখল সব করছে— ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো। তাদের নাম হলো দখলদার অবৈধ সরকার।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের দু-একজন বাদে সব উপদেষ্টার নামে অনেক কথা শোনা যায়। আর নতুন মন্ত্রীদের নামেও অনেক অভিযোগ আছে। এখন এই মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব নিয়ে রাখুন।’ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে সম্পদের হিসাব দেওয়ার পর বন্ধ করার প্রক্রিয়া হস্তক্ষেপ করার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বিদেশে টাকা পাচার করছেন আপনারা। কে, কত টাকা পাচার করছে, সেই তথ্য আমাদের কাছে আছে।’
আগে অনুমতি না দিয়ে গতকাল রাতে সমাবেশের অনুমতি দেওয়ায় প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করেন খালেদা জিয়া। বিএনপির দলীয় কার্যালয় বন্ধ করে রাখা হয়েছে অভিযোগ করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, ‘আমাদের অফিস কেন বন্ধ করে রাখা হয়েছে? আমরা তো কখনো আওয়ামী লীগকে বাধা দিইনি। আপনারা রাস্তায় নৈরাজ্য করার পরও আমরা গুলি চালাইনি।’
খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের ব্যাপারে অভিযোগ করে বলেন, ‘একদলীয় ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে তারা বিশ্বাস করে না। তারা বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের দিয়ে জেল ভরিয়ে ফেলেছে। আমাদের জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে? তাঁদের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দলীয় স্বার্থের বাইরে অন্য কোনো চিন্তা করতে পারেন না। বিএনপি ছাড়া অন্য দলের নেতাদের বন্দী করে রাখা হয়েছে।’ তিনি রাজবন্দীদের মুক্তি দাবি করেন।
খালেদা জিয়া বলেন, বিদেশিরা এই নির্বাচন গ্রহণ করেনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ গায়ের জোরে অবৈধভাবে ক্ষমতায় কাউকে থাকতে দেবে না। তাই তিনি অবিলম্বে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানান।

No comments:

Post a Comment