জ্বলে উঠুন প্রযুক্তির আলোয় …

nirvek' can do to protect women?

নির্ভীক’ কি পারবে নারীদের রক্ষা করতে?

আপডেট: ০২:৫৯, জানুয়ারি ৩১, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ
.ভারতে নারীদের ব্যবহারের জন্য একটি নতুন আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এই আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্যে নারীরা নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন। ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুরে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অস্ত্র কারখানা ইন্ডিয়ান অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি এই আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করেছে।
অস্ত্র কারখানার সাধারণ ব্যবস্থাপক আবদুল হামিদ বিবিসিকে বলেন, ভারতে নারীদের জন্য প্রথম আগ্নেয়াস্ত্র এটি। নারীদের জন্য আকর্ষণীয়ভাবে তৈরি করা হয়েছে অস্ত্রটি। গাঢ় খয়েরি রঙের গয়নার বাক্সে ভরে বাজারজাত করা হচ্ছে। এই আগ্নেয়াস্ত্র খুবই হালকা, মাত্র ৫০০ গ্রাম। মেয়েদের হাতব্যাগে সহজেই এটি রাখা যায়।
আবদুল হামিদ জানান, পয়েন্ট ৩২ ক্যালিবারের এই রিভলবারের কাঠের হাতল বিশেষ টিটেনিয়াম মিশ্রিত ধাতু দিয়ে তৈরি। ছয় বুলেটের এই অস্ত্র সহজেই ব্যবহারযোগ্য। ৫০ ফুট দূরের নিশানায় নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম এটি। রিভলবারের নলে খোদাই করা রয়েছে ‘নির্ভীক’ শব্দটি। এটি আগ্নেয়াস্ত্রটির নাম।
২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে দিল্লিতে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের শিকার ২৩ বছর বয়সী মেডিকেলের ছাত্রী ‘নির্ভয়া’র নামের সাথে মিল রেখে আগ্নেয়াস্ত্রটির নাম রাখা হয়েছে নির্ভীক। নির্ভয়া অবশ্য ওই ছাত্রীর আসল নাম নয়। ভারতীয় আইন অনুযায়ী কোনো ধর্ষিতার নাম প্রকাশ করা নিষেধ। সে জন্য ভারতীয় গণমাধ্যম ওই ছাত্রীর নাম দিয়েছে নির্ভয়া।
আবদুল হামিদ বলেন, ‘নতুন কোনো পণ্য বাজারে আনার আগে আমরা সাধারণত কর্মীদের কাছে নাম আহ্বান করি। আমরা অনেক নাম পেয়েছি। তার মধ্য থেকে নির্ভীক নামটি বেছে নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করছি, যেসব নারী এই আগ্নেয়াস্ত্র বহন করবেন, তিনি কোনো শঙ্কা অনুভব করবেন না।’
দিল্লির বাসে ওই গণধর্ষণের ঘটনার আগেই নারীদের জন্য ছোট অস্ত্র তৈরির কাজ শুরু হয়। দিল্লির ঘটনার পর গতি পায় এই প্রকল্প।
৫ জানুয়ারি থেকে এই আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য ফরমাশ পেতে শুরু করেছে কারখানাটি। আবদুল হামিদ জানান, এই অস্ত্রের দাম এক লাখ ২২ হাজার ৩৬০ রুপি হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা বেশ সাড়া পাচ্ছেন। অনেক দামি হওয়া সত্ত্বেও এরই মধ্যে ১০টি অস্ত্র বিক্রি হয়েছে। অস্ত্র কেনার ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন অনেকে।
তবে এই আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র কোনো নারীকে নিরাপদ করবে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন অনেকে। তবে অস্ত্র নারীকে নিরাপদ করবে বলে মনে করছেন কানপুর ও পাশের কয়েকটি জেলার পুলিশপ্রধান রামকৃষ্ণ চতুর্বেদি। তিনি বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই এটি ভালো ধারণা। আপনার যদি নিবন্ধন করা অস্ত্র থাকে, তাহলে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে। অপরাধীদের মনে ভয় ধরাবে।’
কানপুরের গৃহবধূ ও ছাত্রী প্রতিভা গুপ্ত নির্ভীক কিনতে চান। তিনি বলেন, তবে এর দাম অনেক বেশি। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্রের নিবন্ধন নেওয়াও বেশ ঝামেলাপূর্ণ। তবে প্রতিভার বিশ্বাস, এই অস্ত্র নারীদের শক্তিশালী করবে। তিনি বলেন, ‘কেউ যখন জানবে যে আমার কাছে আগ্নেয়াস্ত্র আছে, তখন সে আমাকে স্পর্শ করতে ইতস্তত করবে। সে বুঝতে পারবে, এই নারীর কাছে যখন আগ্নেয়াস্ত্র আছে, তিনি সেটি ব্যবহারও করতে পারেন।’
দিল্লি-কাণ্ডের পর ভারত সরকার ধর্ষণবিরোধী কড়া আইন পাস করে। সড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। কয়েকটি নগরে নারীদের জন্য হেল্পলাইন চালু করা হয়। কিন্তু তার পরও ভারতের অনেক নারী নিজেদের নিরাপত্তায় নানা উপায় খুঁজতে থাকেন। অনেকে মার্শাল আর্ট শিখতে শুরু করেন। অনেক নারী কিনতে শুরু করেন মরিচের গুঁড়ার স্প্রে।
নির্ভীক নিয়ে অনেক নারী উচ্ছ্বসিত হলেও ক্ষুব্ধ আগ্নেয়াস্ত্রবিরোধী কর্মীরা। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মনিপুর রাজ্যের উইমেন গান সারভাইভারস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা বিনালক্ষ্মী নেপরাম বলেন, ‘আমি আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ।’ তিনি আরও বলেন, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। এটা হাস্যকর যে রাষ্ট্র নারীদের অস্ত্রসজ্জিত হওয়ার কথা বলছে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিরাপত্তা দিতে সরকারের ব্যর্থতা স্বীকার করারই নামান্তর।
কয়েক বছর ধরে ভারতের আটটি রাজ্যে আগ্নেয়াস্ত্র-সন্ত্রাস নিয়ে গবেষণা করে আসছে নেপরামের সংগঠন। নেপরাম বলেন, বন্দুক কাউকে নিরাপদ করে না। এটি আসলে ঝুঁকি বাড়ায়।
নেপরাম বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো সহিংস ঘটনার সময় যাঁর কাছে বন্দুক থাকে, তাঁর গুলিতে মারা যাওয়ার আশঙ্কা ১২ গুণ বেশি।
নেপরাম বলেন, ভারতের বেশির ভাগ মানুষের বার্ষিক আয় একটি নির্ভীকের দামের চেয়ে কম। সুতরাং, এই অস্ত্র নারীদের নিরাপদ করবে—এ ধারণা উদ্ভট।
কানপুরে পাঁচটি অস্ত্রের দোকান রয়েছে মনোজিৎ সিংয়ের। তিনি বলেন, ভারতীয় নারীদের বন্দুক বা পিস্তল ব্যবহার করার ঘটনা বিরল। কোনো নারীর কাছে যদি আগ্নেয়াস্ত্র থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, তিনি এটা বাবা বা স্বামীর কাছ থেকে পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘গত ১০ বছরে আমার দোকানে বন্দুক কেনার জন্য একজন বা দুজন নারী এসেছেন।’
মনোজিৎ সিং বলেন, ভারতের বেশির ভাগ স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের অনুমতি নেই। অফিস-আদালত, বিপণিকেন্দ্র, সিনেমা হল ও বাজারে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। দিল্লিতে গণধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীর কাছে যদি কোনো আগ্নেয়াস্ত্রও থাকত, তবু তিনি এটি ব্যবহার করতে পারতেন না। কারণ, সেদিন তিনি সিনেমা দেখে ফিরছিলেন। আর সিনেমা হলে তো তাঁকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঢুকতে দিত না। আর তিনি যদি হামলাকারীদের কাউকে গুলি করে মেরে ফেলতেন, তাহলে তাঁকে হত্যার অভিযোগে বাকি জীবন জেলে কাটাতে হতো।
দাউদ ইসলাম, সূত্র: বিবিসি