১ রানে টেস্ট জয়!
১৯৯২-৯৩ মৌসুমের ফ্রাঙ্ক ওরেল ট্রফির ব্রিসবেনের প্রথম টেস্টটি শেষ হয় টানটান উত্তেজনায়। হারতে হারতে ম্যাচ ড্র করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মেলবোর্নের দ্বিতীয় টেস্টে ১৩৯ রানে জিতে অস্ট্রেলিয়া পাঁচ ম্যাচ সিরিজে এগিয়ে যায় ১-০তে। রানে ভরপুর সিডনি টেস্ট ড্র। ১-০তে পিছিয়ে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সিরিজ জিততে হলে পরের দুটি টেস্টেই জিততে হতো। ক্রিকেটরাজ্যে তখনো পর্যন্ত নিজেদের সিংহাসন ধরে রাখা ওয়েস্ট ইন্ডিজ তা পেরেও ছিল।
|পার্থে শেষ টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ও ২৫ রানে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই তাদের বধ করে। আর চতুর্থ টেস্টটি জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ গড়ে ইতিহাস। টেস্ট ক্রিকেটে ন্যূনতম রানের ব্যবধান ১ রানে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে গড়ে বিশ্বরেকর্ড। টেস্ট ক্রিকেটে এখনো পর্যন্ত ১ রানে জয়ী একমাত্র দলের নাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
তাদেরই এমন চিরক্ষত উপহার দেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চিরক্ষতই। কেননা সেই ম্যাচের সদস্য টিম মে—২০১০ সালে, এত বছর পরও ভুলতে পারেননি সেই হতাশা। ওই বছর উইজডেন এশিয়া ক্রিকেট ম্যাগাজিনকে মে বলেছিলেন, ‘এটা এত হতাশার যে এখনো পর্যন্ত আমাদের আহত করে।’
২৩ জানুয়ারি অ্যাডিলেডে শুরু হওয়া সিরিজের চতুর্থ টেস্টে টসে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাট করতে নামে। ডেসমন্ড হেইন্স ও ফিল সিমন্স ৮৪ রানের ওপেনিং জুটি গড়ে অধিনায়ক রিচি রিচার্ডসনের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেন। দুজনেই অর্ধশতক দূরে থেকে আউট হলে শুরু হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপর্যয়। হেইন্স ৪৫, সিমন্স ৪৬ রানে আউট হন। এরপর তরুণ ব্রায়ান লারার ৫২ আর উইকেটরক্ষক জুনিয়র মারের অপরাজিত ৪৯ রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৫২। মার্ভ হিউজ ৬৪ রানে নেন ৫ উইকেট। দুই ওয়াহ নেন একটি করে উইকেট।
অ্যামব্রোস, ওয়ালশ আর বিশপের মতো তিন ফাস্ট বোলারের সঙ্গে উদীয়মান বেঞ্জামিনে গড়া পেস অ্যাটাক। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই পেস অ্যাটাক দায়িত্ব পালন করে যথার্থই। ১ রানে টেলর আউট হয়ে আর ১৬ রানে ডেভিড বুন ওয়ালশের বলে আহত হলে বেশ চাপে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। এরপর ৪৮ রানে অভিষিক্ত জাস্টিন ল্যাঙ্গার ব্যক্তিগত ২০ রানে ফিরে গেলে সে চাপ আর সামলাতে পারেনি ক্যাঙ্গারুরা।
স্টিভ ওয়াহর ৪২, হিউজের ৪৩ রানে ভর, তবু ২১৩ করতে সমর্থ হয় অস্ট্রেলিয়া। ৭৪ রানে ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ধ্বংসে নেতৃত্ব দেন অ্যামব্রোস। ৩৯ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করা ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুরু থেকেই খোঁড়াতে থাকে। মাত্র ২২ রানে শেষ ৬ উইকেট হারিয়ে ১৪৬ রানে গুটিয়ে যায় তাদের ইনিংস। কেবল অধিনায়ক রিচার্ডসন একাই লড়াইয়ের চেষ্টা করেন। শেন ওয়ার্নের বলে আউট হওয়ার আগে করেন ৭২ রান। ৬.৫ ওভার বোলিং করে অফস্পিনার টিম মে ৫ উইকেট নেন মাত্র ৯ রানে। টেস্ট এবং সিরিজ জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ১৮৬ রানের।
এমন মামুলি লক্ষ্যকেও অস্ট্রেলিয়ার জন্য দুঃসাধ্যে পরিণত করেন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান বোলাররা। ১০২ রানে অস্ট্রেলিয়ার ৮ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচ জেতাটা সময়ের ব্যাপার করে তোলেন। ল্যাঙ্গারের ৫৪ ও মার্ক ওয়াহর ২৬ রানই উল্লেখ করার মতো সংগ্রহ। এই টেস্টে দুই দলের মোট ১১ জন ব্যাটসম্যান ০ রানে আউট হন। এর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিথ আর্থারটন ও অস্ট্রেলিয়ার ইয়ান হিলি ০ রানে আউট হন উভয় ইনিংসেই। ক্রিকেট চির অনিশ্চয়তার খেলা—অসংখ্যবারের মতো আবারও এই তত্ত্ব প্রমাণেই যেন মঞ্চস্থ হয় অ্যাডিলেডের শেষ অংশ। নবম উইকেটে মার্ভ হিউজকে নিয়ে ল্যাঙ্গার এনে দেন ৪২ রানের জুটি। জয়ের দিকে একটু এগিয়ে অস্ট্রেলিয়া। এরপর ল্যাঙ্গার আউট হয়ে গেলে হিউজ ও ম্যাকডারমট দশম উইকেটে সংগ্রহ করেন আরও ৪০ রান। অর্থাত্ অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ তখন ৯ উইকেটে ১৮৪। জয় থেকে মাত্র দুইবার ক্রিজ বদলের দূরত্বে দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসে ২ উইকেট ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি টিম মে তখন ৪২ রানে অপরাজিত।
নিজের জন্মদিন উদযাপনে এর চেয়ে নায়কোচিত আর কিইবা করতে পারতেন মে। পারতেন দলের জয় এনে দিতে। অস্ট্রেলিয়া তখন ২ রান দূরত্বে। ওয়ালশের বলে ম্যাকডরমটের গ্লাভস ছুঁয়ে যখন বল উইকেটরক্ষক মারের তালুতে, তখনই ডেরেল হেয়ারের তর্জনী ঊর্ধ্বমুখী। ৫৭ হাজার ৫৭৩ জন দর্শকের উপচে পড়া গ্যালারিতে পিনপতন নীরবতা। বল ম্যাকডরমেটের গ্লাভস নাকি হেলমেট ছুঁয়ে গিয়েছিল? হেয়ার কি আরেকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দিলেন?
প্রশ্নগুলো ছাপিয়ে দর্শকদের সান্ত্বনা কেবল রুদ্ধশ্বাসে সমাপ্ত হওয়া ইতিহাসের অন্যতম সেরা টেস্টের অংশীদার হওয়া। ১ রানে জিতে অস্ট্রেলিয়াকে অ্যাডিলেডে আরেকটি লজ্জা উপহার দিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ? দুই দলের মধ্যকার টেস্টে সবচেয়ে বড় রানের জয়ের রেকর্ডটিও যে ক্যারিবিয়ানদের। ১৯৮০ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জেতা ৪০৮ রানের সে টেস্টটিও অ্যাডিলেডে হয়েছিল। কাকতালভাবে সেদিনটিও ছিল ২৬ জানুয়ারি!
ওয়েস্ট ইন্ডিজ যেদিন জিতল, সেদিন ছিল টেস্টের চতুর্থ দিন। অথচ প্রথম দিনের ৪৫ মিনিট ও দ্বিতীয় দিনে ২২০ মিনিট বৃষ্টির কারণে হারিয়ে টেস্টের ফলাফল হবে কি না, তা নিয়েই ছিল সংশয়। কিন্তু ১ রানে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সে সংশয়ই দূর করেনি, পরের টেস্ট জিতে সিরিজও জিতে নেয়। আর সিরিজ হারা অস্ট্রেলিয়ার জন্য ওই ১ রানই হয়ে থাকে এক আক্ষেপের নাম। ১ রানই সিরিজ নির্ধারক হয়নি আর কখনো।
No comments:
Post a Comment