আপডেট:
কিছুটা হিম হিম হাওয়ার মধ্যেই বসন্ত এসেছে পরশু। তারই গায়ে গা ঘেঁষে গতকাল আবার এসেছে হালের হাওয়া লাগা ভ্যালেন্টাইনস ডে। তারই রং ছড়িয়ে পড়েছে সবার মুখে। ফাগুনের দ্বিতীয় দিনের উদাস হাওয়া আর ভালোবাসা দিবস নিয়ে অগণিত মানুষ গতকাল এসেছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। সন্ধ্যা ছয়টায় দেখা গেল, মেলার দুটি কেন্দ্রে যত মানুষ ভেতরে ঢুকতে পেরেছিল, তার দ্বিগুণ ছিল বাইরে অপেক্ষায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান হোসনে আরা ছেলে ইবনকে নিয়ে এসেছিলেন বই কিনতে। কিন্তু প্রবেশপথের এই চিত্র দেখে ঢোকার সাহস হারিয়ে ফেললেন। সখেদে বললেন, ‘মেলায় প্রবেশের অন্তত তিনটি পথ করা উচিত ছিল কর্তৃপক্ষের। এই ভিড়ে আজ আর ভেতরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না।’
ভালোবাসার দিনে
মেয়েটির এক হাতে লাল গোলাপের তোড়া, অন্য হাতে বই। পরনে লাল জামদানি। সঙ্গের তরুণের গায়ে পাঞ্জাবি। জনারণ্য ঠেলে এগোতে এগোতে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন তাঁরা। ভিড়ে হাঁপিয়ে ওঠা ওই যুগলের সঙ্গে একটু আলাপ জমানোর চেষ্টা করি। সংবাদমাধ্যমের কথা শুনে পরিচয় দিতে নারাজ। তবে মেয়েটি আগ্রহ নিয়ে বললেন, ভালোবাসা দিবসে পরস্পরকে বই দেওয়া-নেওয়া করেছেন। মেয়েটির হাতে হুমায়ূন আহমেদের হিমুসমগ্র, আর তরুণটির হাতে একটি ভ্রমণকাহিনি—মঈনুস সুলতানের নিকারাগুয়া সমোটো ক্যানিয়নে গাবরিয়েলা। মেয়েটি বললেন, ‘বিকেলে ভিড় হবে ভেবে এসেছি সকালে। কিন্তু একটু ঘুরে বেড়িয়ে বই কিনব, সে সুযোগ কই। এত্ত মানুষ!’
উদ্যানে দেখা হয় ছড়াকার আখতার হুসেনের সঙ্গে। ভালোবাসা দিবসের বইমেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ছুটির দিন হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আজ (শুক্রবার) মেলায় জনসমাগম বেড়েছে। এখন যদি বইয়ের বিক্রিটা বেশি হয়, তাহলেই দিবসটি সার্থক হবে। তবে ভালোবাসা দিবস ঘিরে প্রেমিক যুগলের হাতে ফুলের সঙ্গে বই দেখার দৃশ্য অন্য রকম সুন্দর। এটা আমাদের সংস্কৃতিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।’
বেলা সাড়ে তিনটায় প্রথমা প্রকাশনের স্টলের সামনে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে কথা হলো তিন যুবকের সঙ্গে। নির্মল কুমার সেন, মনীন্দ্রনাথ রায় ও বেণি মাধব রায় একসঙ্গে এসেছেন দিনাজপুর থেকে। গতকাল ভোরে ঢাকায় নেমেছেন তাঁরা। রাতেই ফিরে যাবেন। নির্মল কুমার জানালেন, শুধু একুশে গ্রন্থমেলায় অংশ নেওয়ার জন্যই ঢাকায় এসেছেন। বললেন, মেলা আর মানুষ দুটো দেখে মনটা ভরে গেল।
যত লোক আসছে, বই বিক্রি সেই হারে বেড়েছে কি? অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের সৈয়দ জাকির হোসেন বললেন, সব মিলিয়েই এবারের বিক্রি আগের যেকোনো মেলার চেয়ে ভালো। মেলায় ফাঁকা পরিসর বেশি বলে পাঠকেরা স্বস্তিতে ঘুরতে-ফিরতে পারছেন।
প্রথমা, অন্যপ্রকাশ, মাওলা, ঐতিহ্য, সময়, পার্ল, দিব্যপ্রকাশ, অনন্যা, আগামী, অবসর, সেবা প্রকাশনীর স্টল সব সময়ই জমজমাট দেখা গেছে। এই স্টলগুলোতে জনপ্রিয় ও আলোচিত বইয়ের মজুত যথেষ্ট। অনুপম, ইত্যাদি, বিভাস, পাঠসূত্র প্রকাশনীর সামনেও ভিড় ছিল যথেষ্ট। বিভাস প্রকাশনীর প্রতিনিধি রামশংকর দেবনাথ জানালেন, সকালবেলাতেই একচোট বেচাকেনা হয়ে গেছে। বিকেল পর্যন্ত সেই ধারা অব্যাহত আছে।
রেকর্ডসংখ্যক ১৯৬টি নতুন বই
মেলার নজরুল মঞ্চে গতকাল উন্মোচিত হয়েছে ১০টি নতুন বইয়ের মোড়ক। মেলার ১৪তম দিনে প্রকাশিত হয়েছে এ বছরের রেকর্ডসংখ্যক ১৯৬টি নতুন বই। এর মধ্যে উপন্যাস ৪৫টি ও কবিতার বই ছিল শীর্ষে ৫৪টি। মেলায় সময় এনেছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের গল্পসল্প, আগামী এনেছে আনোয়ার হোসেনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অবাঞ্ছিত একজন, সময় এনেছে আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্মৃতির মণিকোঠায়, অ্যাডর্ন এনেছে মাহবুব উল্লাহ্র অর্থনীতি চলতি প্রসঙ্গ, ঐতিহ্য এনেছে আফজাল হোসেনের কুহকিনী, পারিজাত এনেছে তাহমিনা কোরাইশীর অহল্য যামিনী ইত্যাদি।
মেলা আজ বেলা ১১টায়গতকাল সকাল নয়টায় বাংলা একাডেমিতে অমর একুশে উদ্যাপন উপলক্ষে শিশু-কিশোরদের সংগীত প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল চারটায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘হাজী মুহম্মদ মুহসীন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আমজাদ হোসেন ও পার্থ সেনগুপ্ত। আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক ওয়াকিল আহমদ, শান্তনু কায়সার ও আবদুল বাছির। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
আজ শিশুদের অভিভাবকসহ স্বাচ্ছন্দ্যে বই কেনার সুবিধার্থে সকাল ১০টা থেকে
বেলা তিনটা পর্যন্ত মেলায় ঘোষণা করা হয়েছে শিশুপ্রহর। মেলা চলবে যথারীতি
রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত। এ ছাড়া সকাল ১০টায় রয়েছে বাংলা একাডেমিতে অমর একুশে
উদ্যাপন উপলক্ষে শিশু-কিশোরদের সাধারণ জ্ঞান এবং উপস্থিত বক্তৃতা
প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত নির্বাচন।
No comments:
Post a Comment