জ্বলে উঠুন প্রযুক্তির আলোয় …

দুফোঁটা নোনা জলে চিরবিদায়

মনিরুল ইসলাম, যশোর | আপডেট: 
ছুটির ঘণ্টা পড়লেই চারজন হই-হুল্লোড় করে বাড়ি ফিরত। আবার সকালে সময়ের আগেই জোট বেঁধে স্কুলে যেত। স্কুলের শিক্ষা সফরেও  চারজন গিয়েছিল জোট বেঁধে। সবকিছু পেছনে ফেলে দল বেঁধেই তারা পাড়ি জমাল না ফেরার দেশে।
চারজনের ছোট্ট নিথর দেহ সাদা কাফনে মুড়ে সারি সারি করে রাখা হলো একই জায়গায়। কেউ জ্বালিয়ে দিলেন আগরবাতি। কেউ ছড়ালেন গোলাপজল। শোকে বিহ্বল হাজারো মানুষ চার বন্ধুকে একপলক দেখতে  ভিড় করল কফিনের সামনে। এই শেষবার দেখা। চারজনকে একসঙ্গে বিদায় দিল সবাই। চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না কেউই। বিদায়বেলায় সবার চোখেই ছিল দুফোঁটা নোনা জল।   
যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা সফরের বাস উল্টে যে সাত শিক্ষার্থী মারা গেছে, তাদের মধ্যে পাঁচজনেরই বাড়ি শার্শার ছোট আঁচড়া গ্রামে। এর মধ্যে চারজনের বাড়ি আবার একই পাড়ায়। এই চারজন হলো আলীর মেয়ে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী উম্মে সুরাইয়া আফরিন, তার বোন তৃতীয় শ্রেণীর মাসুমা আকতার, কালু মিয়ার মেয়ে পঞ্চম শ্রেণীর রুনা আকতার ও লোকমান হোসেনের ছেলে আশরাফুজ্জামান শান্ত। নিহত বাকি তিনজন হলো ছোট আঁচড়া গ্রামের ইউনুচ আলীর মেয়ে মিথিলা খাতুন, পাশের গ্রামের হাসান আলীর মেয়ে আঁখি খাতুন ও গাজীপুর গ্রামের সেকেন্দার আলীর ছেলে সাব্বির হোসেন। তারা সবাই বন্ধু। একসঙ্গে খেলাধুলা, লেখাপড়া, হাসি-কান্না। থেমেও গেল সব একসঙ্গে।
দুর্ঘটনায় একসঙ্গে মারা গেছে দুই বোন সুরাইয়া ও মাসুমা। এমনি এক শনিবারের দিনে তাদের মা মারা গিয়েছিলেন। এর পর থেকে বাবা সৈয়দ আলী ছিলেন মানসিকভাবে অসুস্থ। তাই দুই বোন ছোট আঁচড়া গ্রামে নানার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করত। দুই মেয়ের নিষ্প্রাণ দেহের পাশে হতবাক বসে আছেন বাবা আলী। হঠাত্ এক ফাঁকে বলে উঠলেন, ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই আবার তিনজনকে নিয়ে গেলেন। আমারে যে কেন নেয় না।’
ছেলে শান্তর লাশের পাশে বসে অবিরাম কাঁদছিলেন বাবা লোকমান হোসেন।  বললেন, ‘রাতে ও (শান্ত) আমার কাছে ঘুমিয়েছিল। সকালে ও যখন যাচ্ছে, তখন বাড়ির মোবাইলটা ওকে দিয়ে দিলাম। সারা দিনই তার সঙ্গে কথা হয়েছে। দুর্ঘটনার আধা ঘণ্টা আগেও কথা বলেছি। এরপর ফোনে আর তাকে পেলাম না।’
রাতে উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া চৌগাছা উপজেলার ঝাউতলা এমকেএনজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবদুস সামাদ বলেন, ‘রাতে বাসের কাচ ভেঙে সবাইকে আমরা উদ্ধার করেছি। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। শিশুদের মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। মন আর মানেনি। সকালেই দৌড়ে চলে এসেছি।’
দুপুর দুইটার দিকে বেনাপোল বল্ডফিল্ড মাঠে নিহত সাত শিশুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বেনাপোলের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখে জানাজায় অংশ নেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ গাড়ি ভরে বলফিল্ডে আসে। বেনাপোলজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। টিপটিপ বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে জানাজা পড়েন সবাই। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই শিশুদের বিদায় দেন সবাই। সেখানে শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শ্যামল কান্তি ঘোষ ও যশোরের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
বেনাপোলে তিন দিনের শোক
সকালে বেনাপোলে গিয়েই দেখা গেল, প্রচারমাইকে বেনাপোল পৌরসভায় তিন দিনের শোকের কথা জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুনসান নীরবতা। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, দুরন্ত শিশুদের দুরন্তপনায় যে স্কুল সরগম থাকত, সেই স্কুলে সুনসান নীরবতা। স্কুলে কালো পতাকা টাঙানো হয়েছে। শিক্ষকদের কার্যালয়টি খোলা রয়েছে। উপজেলার সব স্কুলে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। 
হঠাত্ দেখি আমরা পানির মধ্যে
দুর্ঘটনার কবলে পড়া বাসে ছিলেন স্কুলের সহকারী শিক্ষক নাজমা খাতুন। হাসপাতাল থেকে চিকিত্সা নিয়ে তিনি বাড়িতে ফিরেছেন। স্কুলের পাশের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ‘সকাল সাতটার দিকে মেহেরপুরের মুজিবনগরের উদ্দেশে স্কুল থেকে গাড়ি ছেড়ে যায়। সারা দিন ঘোরাঘুরি ও খাওয়া-দাওয়া শেষে সন্ধ্যার আগেই বাস ছাড়া হয়। বাসটি চৌগাছার ঝাউতলা এলাকায় পৌঁছালে হঠাত্ বিকট একটি শব্দ শোনা যায়। তারপর বাসের ভিতরের লাইট বন্ধ হয়ে যায়। পরে দেখি আমরা পানির মধ্যে। আর্তনাদ আর চিত্কার শুনে এলাকার লোকজন এসে আমাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।’
শিশুদের নিয়ে ফিরতে এত দেরি করলেন কেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে নাজমা খাতুন বলেন, সন্ধ্যার আগেই গাড়ি ছাড়া হয়েছে। শিশুদের গাড়ি বলে চালককে ধীরে ধীরে চালাতে বলা হয়েছিল। তা ছাড়া দুপুরে বৃষ্টি ছিল। এসব কারণে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে যায়।
এক গাড়িতে ১০১ জন
শিক্ষা সফরের ওই বাসে ১০১ জনকে গাদাগাদি করে বসানো হয়েছিল। এর মধ্যে ৯২ জন শিক্ষার্থী, ছয়জন শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির ছিলেন তিনজন। বাসের মধ্যে আসনের দ্বিগুণ মানুষ থাকার কারণে মৃতের সংখ্যা বেড়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
অতিরিক্ত মানুষ থাকার কারণে মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে শার্শা উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা ওহেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অতিরিক্ত চাপাচাপি-গাদাগাদির কারণে হয়তো মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। কেমন ব্যবস্থাপনায় স্কুল থেকে শিক্ষা সফরে যাচ্ছে, তা আমাদের অবহিত করা হয়নি। ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকতে পারে।’
গাড়িবহরে বেনাপোল বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বৃত্তিআঁচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও দুটি বাস ছিল। যদিও ওই বাস দুটিতে  কোনো সমস্যা হয়নি।
দুটি তদন্ত কমিটি
দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখার জন্যে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাবিনা ইয়াসমিন আর পুলিশ প্রশাসনের কমিটির প্রধান হচ্ছেন কে এম আরিফুল হক। তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
মামলা দায়ের
বাস দুর্ঘটনায় যশোরের চৌগাছা থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। চৌগাছা থানার উপপরিদর্শক সাহাবুল আলম বাদী হয়ে ওই মামলা করেছেন। মামলার এজাহারে বাসের চালক যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বল্লা গ্রামের ইসরাফিল ও তাঁর সহকারী মহররমকে আসামি করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিয়ার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পর থেকে বাসের চালক ও সহকারী পলাতক। তাঁদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে। বাসটি পুলিশের হেফাজতে রয়েছে বলেও তিনি জানান।

No comments:

Post a Comment