রাজধানীর গণপরিবহন
রাজনীতিকেরাই নিয়ন্ত্রক
আপডেট:
প্রভাবশালী মন্ত্রী, সাংসদসহ ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিকেরা রাজধানীর
গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ করছেন। গণপরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোও
অনেকটা তাঁদের নিয়ন্ত্রণে চলছে। ফলে ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে জনস্বার্থ
উপেক্ষিত হচ্ছে।
সরকারি সূত্রগুলো জানায়, প্রভাবশালী মালিকদের কারণে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে অনুমোদিত কৌশলগত পরিকল্পনা (স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান— এসটিপি) বাস্তবায়নের উদ্যোগ গত পাঁচ বছরেও নেওয়া যায়নি। ফলে এ খাতে নৈরাজ্য কাটছেনা।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সাংসদ পঙ্কজ দেবনাথ, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ শাহিদা তারেখ, সাংসদ নূরে আলম চৌধুরীর (লিটন) চাচাতো ভাই মনির চৌধুরী, সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা, ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের ভাই মমতাজুল ইসলাম, পিরোজপুরের সাংসদ এ কে এম এ আউয়ালের ভাই, সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়ার ছেলেসহ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। কোনো কোনো মন্ত্রী-সাংসদ সরাসরি না জড়িয়ে নেপথ্যে থেকে পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত আছেন।
এর আগে বিএনপি সরকারের সময়ে তৎকালীন মন্ত্রী ও বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাস পরিবহন খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ছিলেন। তাঁর মালিকানাধীন বাস ছিল ঢাকা পরিবহন ও ঢাকা-কিশোরগঞ্জ গন্তব্যের সৌখিন পরিবহনে। এ ছাড়া বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত অনেকে ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবসায় যুক্ত আছেন। তবে তাঁরা এখন কিছুটা কোণঠাসা।
রাজনৈতিক পরিচয় কেন গুরুত্বপূর্ণ: সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলে বাস চলাচলের নতুন পথ (রুট) চালুর অনুমতি মেলে না। রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া বিভিন্ন সময়ে যে দু-একটি নতুন বাস রুটের অনুমতি মিলেছে, সেগুলোর জন্য বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করতে হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
সর্বশেষ গত বছরের অক্টোবরে ঢাকা মহানগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (মেট্রো আরটিসি) বৈঠকে চারটি নতুন পরিবহন কোম্পানি—কনক পরিবহন, প্রজাপতি পরিবহন, হিমাচল পরিবহন ও বসুমতি পরিবহনকে বাস চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এর আগে গত বছর অনুমতি পায় জাবালে নূর পরিবহন।
এসব কোম্পানির মধ্যে কনক পরিবহন হলো নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ভাই হাফিজুর রহমান খানের। এই কোম্পানির ২০টি বাস গাবতলী থেকে মিরপুর হয়ে আবদুল্লাহপুর গন্তব্যে চলার অনুমতি পায়। এর আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পর কনক পরিবহন মিরপুর থেকে আগারগাঁও, মহাখালী, কাকলী হয়ে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত আরেকটি পথে ১৫টি বাস নামানোর অনুমতি পায়।
জাবালে নূর পরিবহনের উদ্যোক্তা অরাজনৈতিক হলেও এর পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মিরপুর যুবলীগের এক নেতা। আরও আছেন মাহমুদ হোসেন নামের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের এক আত্মীয়।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে মাহমুদ হোসেনের শিখর পরিবহন মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী পথে বাস চালানোর অনুমতি পায়। তখন তা উদ্বোধন করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের স্ত্রী। এ ছাড়া শাজাহান খানের পরিবারের মালিকানায় ঢাকা-মাদারীপুরের পথে সার্বিক পরিবহনের বাস চলাচল করে।
প্রজাপতির মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ শাহিদা তারেখ। প্রজাপতি পরিবহনও মিরপুরের নতুন উড়ালসড়ক হয়ে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত ৫০টি বাস চালানোর অনুমতি পায়। বসুমতি পরিবহন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দাকার এনায়েত উল্যাহর। তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থক প্রভাবশালী পরিবহন নেতা। তিনি ঢাকা মহানগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) আঞ্চলিক সদস্য। মহানগর পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি মূলত কোন পথে কোন বাস চলাচল করবে, তার অনুমতি দেয়।
অবশ্য খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ দাবি করেন, রাজনৈতিকভাবে নয়, সড়কের অবস্থা বিবেচনা করে বাস চলাচলের (রুট পারমিট) অনুমতি দেওয়া হয়।
কিন্তু ২০০৯ সালে মহাজোট সরকারের শুরুতে বিহঙ্গ পরিবহন মিরপুর থেকে দুটি গন্তব্যে ৩২টি বাস চালানোর অনুমতি পায়। বিহঙ্গের চেয়ারম্যান স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ। তিনি এবার বরিশাল থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে সাংসদ হয়েছেন। আরটিসির সর্বশেষ বৈঠকে বিহঙ্গকে দোয়ারীপাড়া থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত রুটে আরও আটটি বাস নামানোর অনুমতি দেওয়া হয়।
আজিমপুর থেকে উত্তরা পথে চলাচলকারী ‘সূচনা-বিআরএফ’ পরিবহনে রয়েছে সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়ার ছেলে আরিফুজ্জামানের (রনি) বাস। একই গন্তব্যে চলাচলকারী দ্বীপ বাংলা পরিবহনেও আরিফুজ্জামানের বাস চলত।
সাংসদ নূরে আলম চৌধুরীর চাচাতো ভাই মনির চৌধুরীর বাস চলে ‘সূচনা-বিআরএফ’ পরিবহনে।
এ ছাড়া সমবায় প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতা মসিউর রহমানের মালিকানাধীন বাস চলাচল করে ঢাকার বাইরে রংপুরে। ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের ভাই মমতাজুল ইসলামের বাস চলে ঢাকা-ময়মনসিংহ গন্তব্যে শামীম এন্টারপ্রাইজে। পিরোজপুরের সাংসদ আবদুল আউয়ালের ভাই মশিউর রহমানের বাস চলাচল করে ওই জেলার বিভিন্ন পথে।
জানতে চাইলে নৌপরিবহনমন্ত্রী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরি সভাপতি শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, রাজনীতিকেরা ব্যবসা করলেই খারাপ হবে আর অরাজনৈতিক হলে ভালো হয়ে যাবে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। বাংলাদেশের সবাই রাজনীতি করেন।
নিজের পরিবারের পরিবহন ব্যবসা সম্পর্কে সরকারের এই মন্ত্রী বলেন, ‘আমার পরিবার অনেক আগে থেকে এই ব্যবসা করছে। ব্যবসা করতে কারও বাধা নেই।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, বর্তমানে ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৪০৭টি।
যেভাবে নিয়ন্ত্রণে নেন: অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজে বা আত্মীয়স্বজনের নামে দু-একটা বাস কিনে প্রথমে একটি কোম্পানি খোলেন। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তির বাস ওই কোম্পানির অধীনে চালানোর জন্য নিয়ে আসেন। বিনিময়ে কোম্পানির উদ্যোক্তারা প্রতিটি বাস থেকে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায় করেন। এটাকে তাঁরা নাম দিয়েছেন ‘জিপি’ (গেট পাস)। পুলিশ ও এই খাতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘সন্তুষ্ট’ করা এবং কোম্পানির খরচের নামে এই জিপি আদায় করা হয়। এই ‘বাণিজ্য’ ধরে রাখার জন্য যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত পরিবহন মালিক ও শ্রমিকনেতারা এই খাতের নিয়ন্ত্রণ করেন।
জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের বিগত আমলে (২০০৯-২০১৩) একজন মন্ত্রী পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এর জন্য সংসদীয় কমিটিতে শুনানিও হয়। মন্ত্রীর পক্ষ থেকে এ ধরনের অসাংবিধানিক উদ্যোগের ফলেই বোঝা যায়, পরিবহন খাত কতটা ঝুঁকির মধ্যে আছে।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ এন সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, সরকার বিআরটিসির মাধ্যমে সাড়ে নয় শ বাস এনেছে। এর বেশির ভাগই ঢাকায় নামানো হয়েছে। কিন্তু সরকারের নীতি-সহায়তা পাওয়ার পরও বেসরকারি খাত সঠিক ভূমিকা রাখতে পারছে না। শিগগিরই সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক ডাকা হচ্ছে। সেখানে সাধারণ মানুষের স্বার্থের জন্য যতটা কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার, তা নেওয়া হবে বলে সচিব দাবি করেন।
অসুস্থ প্রতিযোগিতা: অভিযোগ রয়েছে, কোন পথে কত বাসের চাহিদা, সেটা না দেখেই চলাচলের অনুমতি দেয় ঢাকা মেট্রো আরটিসি। মালিকের সুবিধামতো বাসের পথ অনুমোদন করার কারণে রাজধানীর কিছু গন্তব্যে বেশি বাস চলে। আবার কিছু গন্তব্যে যাত্রীরা ঠিকভাবে বাসই পান না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিরপুর ও পল্লবী এলাকা থেকে ৪২টি কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ঢাকা শহরের উত্তর-দক্ষিণমুখী পথগুলোতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাস চলাচল করে। পূর্ব-পশ্চিমে এ সংখ্যা অনেক কম।
একই স্থান থেকে একাধিক বাস চলার পথ অনুমোদন এবং একাধিক মালিক থাকার কারণে কার আগে কে যাত্রী তুলবে, এ নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
এক কোম্পানির বাস যাত্রী তোলার সময় অন্য কোম্পানির বাস যাতে না যেতে পারে, সে জন্য রাস্তায় আড়াআড়িভাবে দাঁড় করিয়ে যানজটের সৃষ্টি করা হয়। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যাত্রীদের ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়ারও ঘটনা ঘটে অহরহ।
পরিবহন শ্রমিকেরা জানান, রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ বাস-মিনিবাসের গায়ে যে ক্ষত, রংচটা অবস্থা, এর মূল কারণ একই পথে একাধিক কোম্পানির বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
পরিবহন খাতের নৈরাজ্য সম্পর্কে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রের নীতি-কাঠামোর মধ্যে অবৈধ উপায়ে ও প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ অর্জনের লোকজন বেড়ে গেছে। পরিবহন খাতে এটা আরও প্রকট। তঁর মতে, পরিবহন খাতের গণদুর্ভোগ ও চাঁদাবাজির ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার মূল কারণ, এই খাতে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্র্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিচরণ। এর সরাসরি শিকার হয় সাধারণ মানুষ।
সরকারি সূত্রগুলো জানায়, প্রভাবশালী মালিকদের কারণে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে অনুমোদিত কৌশলগত পরিকল্পনা (স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান— এসটিপি) বাস্তবায়নের উদ্যোগ গত পাঁচ বছরেও নেওয়া যায়নি। ফলে এ খাতে নৈরাজ্য কাটছেনা।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সাংসদ পঙ্কজ দেবনাথ, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ শাহিদা তারেখ, সাংসদ নূরে আলম চৌধুরীর (লিটন) চাচাতো ভাই মনির চৌধুরী, সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা, ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের ভাই মমতাজুল ইসলাম, পিরোজপুরের সাংসদ এ কে এম এ আউয়ালের ভাই, সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়ার ছেলেসহ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। কোনো কোনো মন্ত্রী-সাংসদ সরাসরি না জড়িয়ে নেপথ্যে থেকে পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত আছেন।
এর আগে বিএনপি সরকারের সময়ে তৎকালীন মন্ত্রী ও বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাস পরিবহন খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ছিলেন। তাঁর মালিকানাধীন বাস ছিল ঢাকা পরিবহন ও ঢাকা-কিশোরগঞ্জ গন্তব্যের সৌখিন পরিবহনে। এ ছাড়া বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত অনেকে ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবসায় যুক্ত আছেন। তবে তাঁরা এখন কিছুটা কোণঠাসা।
রাজনৈতিক পরিচয় কেন গুরুত্বপূর্ণ: সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলে বাস চলাচলের নতুন পথ (রুট) চালুর অনুমতি মেলে না। রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া বিভিন্ন সময়ে যে দু-একটি নতুন বাস রুটের অনুমতি মিলেছে, সেগুলোর জন্য বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করতে হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
সর্বশেষ গত বছরের অক্টোবরে ঢাকা মহানগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (মেট্রো আরটিসি) বৈঠকে চারটি নতুন পরিবহন কোম্পানি—কনক পরিবহন, প্রজাপতি পরিবহন, হিমাচল পরিবহন ও বসুমতি পরিবহনকে বাস চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এর আগে গত বছর অনুমতি পায় জাবালে নূর পরিবহন।
এসব কোম্পানির মধ্যে কনক পরিবহন হলো নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ভাই হাফিজুর রহমান খানের। এই কোম্পানির ২০টি বাস গাবতলী থেকে মিরপুর হয়ে আবদুল্লাহপুর গন্তব্যে চলার অনুমতি পায়। এর আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পর কনক পরিবহন মিরপুর থেকে আগারগাঁও, মহাখালী, কাকলী হয়ে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত আরেকটি পথে ১৫টি বাস নামানোর অনুমতি পায়।
জাবালে নূর পরিবহনের উদ্যোক্তা অরাজনৈতিক হলেও এর পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মিরপুর যুবলীগের এক নেতা। আরও আছেন মাহমুদ হোসেন নামের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের এক আত্মীয়।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে মাহমুদ হোসেনের শিখর পরিবহন মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী পথে বাস চালানোর অনুমতি পায়। তখন তা উদ্বোধন করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের স্ত্রী। এ ছাড়া শাজাহান খানের পরিবারের মালিকানায় ঢাকা-মাদারীপুরের পথে সার্বিক পরিবহনের বাস চলাচল করে।
প্রজাপতির মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ শাহিদা তারেখ। প্রজাপতি পরিবহনও মিরপুরের নতুন উড়ালসড়ক হয়ে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত ৫০টি বাস চালানোর অনুমতি পায়। বসুমতি পরিবহন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দাকার এনায়েত উল্যাহর। তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থক প্রভাবশালী পরিবহন নেতা। তিনি ঢাকা মহানগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) আঞ্চলিক সদস্য। মহানগর পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি মূলত কোন পথে কোন বাস চলাচল করবে, তার অনুমতি দেয়।
অবশ্য খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ দাবি করেন, রাজনৈতিকভাবে নয়, সড়কের অবস্থা বিবেচনা করে বাস চলাচলের (রুট পারমিট) অনুমতি দেওয়া হয়।
কিন্তু ২০০৯ সালে মহাজোট সরকারের শুরুতে বিহঙ্গ পরিবহন মিরপুর থেকে দুটি গন্তব্যে ৩২টি বাস চালানোর অনুমতি পায়। বিহঙ্গের চেয়ারম্যান স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ। তিনি এবার বরিশাল থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে সাংসদ হয়েছেন। আরটিসির সর্বশেষ বৈঠকে বিহঙ্গকে দোয়ারীপাড়া থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত রুটে আরও আটটি বাস নামানোর অনুমতি দেওয়া হয়।
আজিমপুর থেকে উত্তরা পথে চলাচলকারী ‘সূচনা-বিআরএফ’ পরিবহনে রয়েছে সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়ার ছেলে আরিফুজ্জামানের (রনি) বাস। একই গন্তব্যে চলাচলকারী দ্বীপ বাংলা পরিবহনেও আরিফুজ্জামানের বাস চলত।
সাংসদ নূরে আলম চৌধুরীর চাচাতো ভাই মনির চৌধুরীর বাস চলে ‘সূচনা-বিআরএফ’ পরিবহনে।
এ ছাড়া সমবায় প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতা মসিউর রহমানের মালিকানাধীন বাস চলাচল করে ঢাকার বাইরে রংপুরে। ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের ভাই মমতাজুল ইসলামের বাস চলে ঢাকা-ময়মনসিংহ গন্তব্যে শামীম এন্টারপ্রাইজে। পিরোজপুরের সাংসদ আবদুল আউয়ালের ভাই মশিউর রহমানের বাস চলাচল করে ওই জেলার বিভিন্ন পথে।
জানতে চাইলে নৌপরিবহনমন্ত্রী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরি সভাপতি শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, রাজনীতিকেরা ব্যবসা করলেই খারাপ হবে আর অরাজনৈতিক হলে ভালো হয়ে যাবে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। বাংলাদেশের সবাই রাজনীতি করেন।
নিজের পরিবারের পরিবহন ব্যবসা সম্পর্কে সরকারের এই মন্ত্রী বলেন, ‘আমার পরিবার অনেক আগে থেকে এই ব্যবসা করছে। ব্যবসা করতে কারও বাধা নেই।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, বর্তমানে ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৪০৭টি।
যেভাবে নিয়ন্ত্রণে নেন: অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজে বা আত্মীয়স্বজনের নামে দু-একটা বাস কিনে প্রথমে একটি কোম্পানি খোলেন। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তির বাস ওই কোম্পানির অধীনে চালানোর জন্য নিয়ে আসেন। বিনিময়ে কোম্পানির উদ্যোক্তারা প্রতিটি বাস থেকে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায় করেন। এটাকে তাঁরা নাম দিয়েছেন ‘জিপি’ (গেট পাস)। পুলিশ ও এই খাতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘সন্তুষ্ট’ করা এবং কোম্পানির খরচের নামে এই জিপি আদায় করা হয়। এই ‘বাণিজ্য’ ধরে রাখার জন্য যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত পরিবহন মালিক ও শ্রমিকনেতারা এই খাতের নিয়ন্ত্রণ করেন।
জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের বিগত আমলে (২০০৯-২০১৩) একজন মন্ত্রী পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এর জন্য সংসদীয় কমিটিতে শুনানিও হয়। মন্ত্রীর পক্ষ থেকে এ ধরনের অসাংবিধানিক উদ্যোগের ফলেই বোঝা যায়, পরিবহন খাত কতটা ঝুঁকির মধ্যে আছে।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ এন সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, সরকার বিআরটিসির মাধ্যমে সাড়ে নয় শ বাস এনেছে। এর বেশির ভাগই ঢাকায় নামানো হয়েছে। কিন্তু সরকারের নীতি-সহায়তা পাওয়ার পরও বেসরকারি খাত সঠিক ভূমিকা রাখতে পারছে না। শিগগিরই সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক ডাকা হচ্ছে। সেখানে সাধারণ মানুষের স্বার্থের জন্য যতটা কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার, তা নেওয়া হবে বলে সচিব দাবি করেন।
অসুস্থ প্রতিযোগিতা: অভিযোগ রয়েছে, কোন পথে কত বাসের চাহিদা, সেটা না দেখেই চলাচলের অনুমতি দেয় ঢাকা মেট্রো আরটিসি। মালিকের সুবিধামতো বাসের পথ অনুমোদন করার কারণে রাজধানীর কিছু গন্তব্যে বেশি বাস চলে। আবার কিছু গন্তব্যে যাত্রীরা ঠিকভাবে বাসই পান না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিরপুর ও পল্লবী এলাকা থেকে ৪২টি কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ঢাকা শহরের উত্তর-দক্ষিণমুখী পথগুলোতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাস চলাচল করে। পূর্ব-পশ্চিমে এ সংখ্যা অনেক কম।
একই স্থান থেকে একাধিক বাস চলার পথ অনুমোদন এবং একাধিক মালিক থাকার কারণে কার আগে কে যাত্রী তুলবে, এ নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
এক কোম্পানির বাস যাত্রী তোলার সময় অন্য কোম্পানির বাস যাতে না যেতে পারে, সে জন্য রাস্তায় আড়াআড়িভাবে দাঁড় করিয়ে যানজটের সৃষ্টি করা হয়। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যাত্রীদের ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়ারও ঘটনা ঘটে অহরহ।
পরিবহন শ্রমিকেরা জানান, রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ বাস-মিনিবাসের গায়ে যে ক্ষত, রংচটা অবস্থা, এর মূল কারণ একই পথে একাধিক কোম্পানির বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
পরিবহন খাতের নৈরাজ্য সম্পর্কে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রের নীতি-কাঠামোর মধ্যে অবৈধ উপায়ে ও প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ অর্জনের লোকজন বেড়ে গেছে। পরিবহন খাতে এটা আরও প্রকট। তঁর মতে, পরিবহন খাতের গণদুর্ভোগ ও চাঁদাবাজির ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার মূল কারণ, এই খাতে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্র্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিচরণ। এর সরাসরি শিকার হয় সাধারণ মানুষ।
No comments:
Post a Comment