জ্বলে উঠুন প্রযুক্তির আলোয় …

জঙ্গি ও সন্ত্রাসমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার

আপডেট:
ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন। এই শ্রদ্ধা থেকে  উচ্চারিত হলো সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি । ছবি: প্রথম আলোকণ্ঠে ছিল অমর একুশের গান। হাতে ফুল। নগ্নপদে হেঁটে গেলেন তাঁরা। তাঁদের শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে পরিপূর্ণ হলো বাঙালির শোকের মিনার, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত শহীদ মিনার।
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপন। চলে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত। দিবসটি উদ্যাপন উপলক্ষে জাতীয় পতাকা ছিল অর্ধনমিত, উত্তোলন করা হয় কালো পতাকা। সমগ্র জাতি অপার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করেছে মৃত্যুঞ্জয়ী ভাষাশহীদদের।
এবারের আয়োজনে সর্বত্রই উচ্চারিত হয়েছে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়। সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের কথাও ঘুরেফিরে আলোচিত হয়েছে। এ যেন বাংলাকে উপলব্ধি করা, ফিরে দেখার আয়োজনও।
মিরপুরের বাসিন্দা অমিত পাল শহীদ মিনারে এসেছিলেন স্ত্রী কাকলী ও ছয় বছর বয়সী শিশুপুত্র ভাস্করকে নিয়ে। অমিত পাল বলেন, ‘জন্মের পর থেকে প্রতিবছর ছেলেকে নিয়ে শহীদ মিনারে আসছি, এখানে এসে নিশ্চয়ই সে ইতিহাস জানতে অনুপ্রাণিত হবে। বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের প্রতি তার ভালোবাসা জন্মাবে।’
ভাস্করের গালে ছিল শহীদ মিনার আঁকা। পোশাকে বর্ণমালা খচিত। ওর মা-বাবা পরেছিলেন সাদা-কালো পোশাক।
রাজধানীর পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে বইমেলা—সর্বত্রই ছিল একুশে উদ্যাপনের আবহ। তবে সব আয়োজন গিয়ে মিলেছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।
৬২ বছর আগের গৌরবোজ্জ্বল সেই দিনটিকে ফিরে দেখা হলো আবার। ১৯৫২ সালের একুশের এই দিনটিতে ঢাকার রাজপথ হয়ে উঠেছিল উত্তাল। পাকিস্তানি শাসকদের হুমকি-ধমকি আর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভেঙে মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে পথে নেমে এসেছিল নানা বয়সী অসংখ্য মানুষ। বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। গুলি চালানো হলো মিছিলে। সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ বাংলা মায়ের অকুতোভয় সন্তানদের তাজা রক্তে রঞ্জিত হলো দেশের মাটি। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ওই আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা।
ভাষার জন্য বাঙালির এই আত্মদানের দিনটিকে ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বাঙালির এই আত্মত্যাগের দিনটি তাই এখন আর বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, পালন করা হচ্ছে সারা বিশ্বে।
ফুলে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার: বৃহস্পতিবার রাত ১১টার পর থেকেই শাহবাগ, আজিমপুর, নীলক্ষেতসহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাওয়ার প্রতিটি প্রবেশপথেই ছিল মানুষের মিছিলের সারি। রাত থেকেই মানুষের ঢল নামে। পুব আকাশে ভোরের লাল সূর্য উঁকি দিতেই শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসা সর্বস্তরের মানুষের সারি দীর্ঘ হতে শুরু করে। জগন্নাথ হল, পলাশী মোড় ছাড়িয়ে যায়। দীর্ঘ সারিতে ফুল আর ছোট ছোট পতাকা হাতে অপেক্ষা করতে দেখা যায় সব বয়স, শ্রেণী ও পেশার মানুষকে।
শহীদ মিনারের আশপাশের এলাকায় মাইকে বাজানো হচ্ছিল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ইত্যাদি গান। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকানে এবং হাতে করে ফেরিওয়ালারা বিক্রি করেছেন ছোট ছোট পতাকা, একুশের বাণী লেখা মাথায় বাঁধার ফিতা, শহীদদের ছবিসহ পোস্টকার্ড।
পোশাকে, রঙে, আঁকায় একুশ: শহীদ মিনারে আসা নগরবাসীর পোশাকেও উৎকীর্ণ হয়েছে একুশের শোকসন্তাপ। বেশির ভাগ নর-নারীর শাড়ি ও পাঞ্জাবিতে সাদা আর কালো রঙের ব্যবহার দেখা গেছে। শাড়ি ও পাঞ্জাবিতে খচিত ছিল বর্ণমালা, কবিতার চরণ, গানের কলি। আবার লাল-সবুজের বাংলাদেশকে ধারণ করতে দেখা গেছে কারও কারও পোশাকে। শিশুর গালে, কপালে আঁকা ছিল শহীদ মিনার। জাতীয় পতাকার ছবিও আঁকিয়ে নিয়েছিল অনেকেই। বড়রাও অনেকে এসব নকশায় চিত্রিত করেছেন গাল-কপাল-কপোল-বাহু। সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এবং জাতীয় জাদুঘরের সামনে হাতে তুলি আর রং নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আঁকিয়েরা।
শহীদ মিনার ছাড়িয়ে: শহীদ মিনার থেকে বইমেলা, সেখান থেকে ধানমন্ডিতে আয়োজিত বর্ণমেলাসহ নানা অনুষ্ঠান আয়োজন আর আড্ডায় কেটেছে একুশের দিনটি। প্রথম প্রহর থেকে একুশে উদ্যাপনের নানান আয়োজন ছিল শাহবাগে। নাটকের দল তীরন্দাজ আয়োজন করেছিল প্রভাতফেরির নাটক। ১২টা ১ মিনিটে শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত চলে তীরন্দাজের নাটক পরিবেশনা। যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোগে গতকাল শাহবাগে ভাষার গান ও পঙিক্তমালা শিরোনামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অভিযোগ: বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান প্রথম আলোকে বলেন, রাতে গুলশানে পুলিশ অবরোধ দেওয়ার কারণে খালেদা জিয়া প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পৌঁছাতে পারেননি। পরে তিনি রাত একটা এক মিনিটে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

No comments:

Post a Comment