জ্বলে উঠুন প্রযুক্তির আলোয় …

বিএনপি নেতাসহ এক রাতে  সাতজন ‘নিখোঁজ’

আপডেট

আড়াই মাস ধরে ‘নিখোঁজ’ ঢাকা মহানগর বিএনপির এক নেতাসহ সাত যুবক। গত ৪ ডিসেম্বর পৃথক সময়ে ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয় দিয়ে তাঁদের উঠিয়ে নেওয়া হয়।
তাঁদের পরিবার দাবি করেছে, বিএনপির নেতাসহ ছয়জনকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। বাকি একজনকে রাজধানীর তেজগাঁও থানার শাহীনবাগের বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৪ ডিসেম্বর রাত সাড়ে আটটার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই-ব্লক থেকে ঢাকা মহানগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম ওরফে সুমন (৩৪), তাঁর খালাতো ভাই জাহিদুল করিম ওরফে তানভীরসহ (৩০) ছয়জনকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বাকি চারজন হলেন পূর্ব নাখালপাড়ার বাসিন্দা আবদুল কাদের ভূঁইয়া ওরফে মাসুম (২৪), পশ্চিম নাখালপাড়ার মাজহারুল ইসলাম ওরফে রাসেল (২৪), মুগদার আসাদুজ্জামান ওরফে রানা (২৭) ও উত্তর বাড্ডার আল আমিন (২৬)। কয়েক ঘণ্টা পর রাত দুইটার দিকে শাহীনবাগের বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় এ এম আদনান চৌধুরী (২৮) নামের একজনকে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পরিবার জানিয়েছে, সাজেদুলসহ ছয়জনকে ‘র‌্যাব-১’ লেখা কয়েকটি গাড়ি থেকে কালো পোশাক পরা অস্ত্রধারী কয়েকজন নেমে উঠিয়ে নিয়ে যান। আদনানকে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পরনের কালো পোশাকের ওপর ‘র‌্যাব’ লেখা ছিল।
বসুন্ধরা থেকে উঠিয়ে নেওয়া ছয়জনের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক কিসমত হায়াত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি, র‌্যাব-১-এর কেউ ওই ছয়জনকে আটক করেনি।’
তাঁদের সন্ধানে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কি না—জানতে চাইলে কিসমত হায়াত বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো কূল-কিনারা পাইনি।’
‘নিখোঁজ’ বিএনপির নেতা সাজেদুলের বাসা শাহীনবাগ এলাকায়। তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানান, রাজনৈতিক কারণে বসুন্ধরায় খালার বাসাসহ বিভিন্ন আত্মীয়র বাসায় থাকতেন সাজেদুল। ওই খালার একটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। ওই ভবনের নিচে গত ৪ ডিসেম্বর রাত সাড়ে আটটার দিকে সাজেদুল, তাঁর খালাতো ভাই জাহিদুলসহ ছয়জন মুড়ি ও চানাচুর খাচ্ছিলেন। তখনই তাঁদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছেন, ‘র‌্যাব-১’ লেখা তিনটি গাড়িসহ কয়েকটি গাড়িযোগে কালো পোশাক পরা অস্ত্রধারী কয়েকজন ভবনটির সামনে এসে ‘সুমন (সাজেদুল) কে’ জানতে চায়। পরিচয় দেওয়ার পর সবাইকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনাস্থল ভাটারা থানার অধীন হলেও থানায় গেলে পুলিশ জিডি নেয়নি। শুধু ‘বাসা থেকে বের হওয়ার পর ফিরে আসেনি’—এটা লেখার শর্ত মেনে জাহিদুল, আবদুল কাদের, মাজহারুল ও আসাদুজ্জামানের পরিবার গুলশান, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও মুগদা থানায় জিডি করেছে। আল আমিনের পরিবার জানায়, তারা বাড্ডা থানায় জিডি ও ভাটারা থানায় কারও নাম উল্লেখ না করে মামলা করেছে।
ভাটারা থানার ওসি মোহাম্মদ আলী জানান, মামলাটির তদন্ত চলছে। ‘নিখোঁজ’ অন্যদের জিডি না নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জিডি নেব কেন, মামলা নেব।’
মাজহারুল, আসাদুজ্জামান ও আল আমিনের নাম ছাত্রদলের দপ্তর থেকে পাঠানো ১৯ জনের ‘গুমের তালিকায়’ও আছে। পরিবারগুলো জানিয়েছে, র‌্যাব-১ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার দেখা করেও কোনো সুরাহা মেলেনি।
জাহিদুল একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিজেদের নির্মাণাধীন ভবনের কাজ দেখভাল করছিলেন। আবদুল কাদের সরকারি তিতুমীর কলেজের ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের সম্মান শেষ বর্ষের ছাত্র। মাজহারুল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। ৩৪তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইন বিষয়েও পড়াশোনা করছিলেন।
আসাদুজ্জামান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিভাগে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি খুঁজছিলেন। আল আমিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সম্মান শেষ করার পর অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা ও স্থানীয় হওয়ার সূত্রে আবদুল কাদের, মাজহারুল, আসাদুজ্জামান ও আল আমিন একে অপরের পরিচিত ও বিএনপির রাজনীতির সমর্থক বলে তাঁদের পরিবার থেকে জানানো হয়েছে।
আর নিখোঁজ আদনান উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনিও বিএনপির সমর্থক।
আবদুল কাদেরের ভাই সাদেকুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় হওয়ায় বিএনপির নেতা সাজেদুলের সঙ্গে আবদুল কাদেরসহ কয়েকজনের পরিচয় ছিল। ৪ ডিসেম্বর বিকেলে নাখালপাড়ার বাসা থেকে বের হয়ে আবদুল কাদেরসহ চারজন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যান। সেখানেই ঘটনা ঘটে।
নিখোঁজ আদনানের বাবা রুহুল আমিন বলেন, গত ৪ ডিসেম্বর রাত দুইটার দিকে শাহীনবাগের বাসার মূল ফটকে কয়েকজন করাঘাত করলে তিনি দরজা খুলে দেন। দেখেন, বাসার সামনে ১৪-১৫ জন কালো পোশাকধারী লোক একটি সাদা ও একটি ছাই রঙের মাইক্রোবাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রত্যেকের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। তাঁরা প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে বাসার ভেতরে ঢোকেন এবং আদনানকে খুঁজতে থাকেন। আদনান তাঁর কক্ষ থেকে বের হন। কালো পোশাকধারী লোকেরা পুরো বাসায় তল্লাশি চালান। শেষে আদনানকে তাঁরা একটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে যান। তবে কিছুক্ষণের মধ্যে আদনানকে দিয়ে যাবেন বলেও পরিবারকে আশ্বস্ত করেছিলেন তাঁরা।
রুহুল আমিন বলেন, কালো পোশাকধারীরা সবাই হাফ হাতা জ্যাকেটও পরা ছিলেন। কোমর বরাবর জ্যাকেটে হলুদ রঙে ‘র‌্যাব’ লেখা ছিল।
আদনান বিবাহিত। লেখাপড়ায় ১০ বছরের ছেদ ছিল। গত বছর তিনি তেজগাঁওয়ের একটি কলেজ থেকে প্রাইভেটে এইচএসসি পাস করেছেন। মালয়েশিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। গত ১২ ডিসেম্বর তাঁর ভিসাও হাতে এসেছিল।
যোগাযোগ করা হলে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক হাবিবুর রহমান আদনানকে আটকের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের পোশাকে কোমর বরাবর হলুদ রঙে “র‌্যাব” লেখা থাকে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’
শাহীনবাগে বিএনপির নেতা সাজেদুলের বাসা থেকে কয়েক মিনিট হেঁটে দক্ষিণ দিকে গেলেই আদনানের বাসা। সম্প্রতি ওই দুজনের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, হতাশা আর আতঙ্কে অসহায় হয়ে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
সাজেদুলের মা হাজেরা খাতুন বলেন, সাজেদুল বিএনপির রাজনীতি করলেও এলাকায় সব দলের লোকের কাছে তিনি সমান জনপ্রিয়। কোনো অপরাধের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ আমার ছেলেকে না নিয়ে থাকে, তাহলে আমি অনুরোধ করব, আমার ছেলেকে যেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার করেন।’
নিখোঁজ জাহিদুল, আবদুল কাদের, আসাদুজ্জামান, আল আমিন ও মাজহারুলের পরিবারের সদস্যরা একই দাবি জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ওই পাঁচজনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। তার পরও যদি তাঁদের কোনো অপরাধ থাকে, তাহলে তাঁদের আইনের মুখোমুখি করা হোক।
আদনানের বাবা রুহুল আমিন বলেন, ‘সরকারের কাছে আমার একটাই আকুতি, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।’
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নিখোঁজ ব্যক্তিদের কয়েকজনকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তাঁদের পরিবারের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। ঘটনার দুই দিন পরে আমি বিষয়টি জানতে পারি। তখন আমি সাংসদ ছিলাম। তখনো তাঁদের বিষয়ে খোঁজখবর করার চেষ্টা করেছি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই স্বজনেরা আমার কাছে এসেছিলেন। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারছি না। সব সংস্থাই তাঁদের আটক করার কথা রিফিউজ (অস্বীকার) করেছে। কোথাও থেকে আমি কোনো সন্তোষজনক সংবাদ পাইনি।’

No comments:

Post a Comment